শেখ হাসিনার সাফল্যে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে বাংলাদেশ


শেখ হাসিনার সাফল্যে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে বাংলাদেশ


বাংলাদেশের একাদশ জাতীয় নির্বাচনে শেখ হাসিনার নজিরবিহীন জয় তাঁকে রেকর্ড চতুর্থবারের মতো ক্ষমতায় আসীন করেছে। এর ফলে ভারতের পূর্বাঞ্চলীয় সীমান্তে স্থিতিশীলতাই কেবল অব্যাহত থাকবে না, বাংলাদেশের সঙ্গে উপ-আঞ্চলিক অংশীদারিত্বের মহাসুযোগের দ্বারও খুলে যাবে। ভারত ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার মধ্যে উপ-আঞ্চলিক অংশীদারিত্বের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ কাজ করছে সেতুবন্ধন হিসেবে। শেখ হাসিনার এই সাফল্য ঢাকা ও বঙ্গোপসাগরীয় অঞ্চলের জন্য নতুন অর্থনৈতিক সুযোগ-সুবিধা তৈরি করে দেবে।

গত এক দশকে বাংলাদেশের বিস্ময়কর অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি লক্ষ্য করা গেছে। তার আগের কয়েক বছরের সময়কালে, বিশেষত সামরিক বা সেনাসমর্থিত সরকারের আমলে যে অর্থনীতি ছিল তাকে বলা যায়, একটা বাসকেট কেস বা ঝুড়ির বাক্স। এই আমলে জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বে উগ্রপন্থিদের প্রভাব ও প্রতিপত্তি ছিল। এমনকি শেখ হাসিনা সরকারের কড়া সমালোচনা থাকা সত্ত্বেও সকলেই একমত যে, গত এক দশকে সাত শতাংশের বেশি প্রবৃদ্ধি বাংলাদেশকে একটি মধ্যম আয়ের অর্থনৈতিক দেশের মর্যাদায় অভিষিক্ত করেছে। দ্রুত মধ্যবিত্তের বিকাশ ও অর্থনৈতিক গতিশীলতার দিক থেকে ঢাকা এখন ভারতের পূর্বাঞ্চলের উন্নত অনেক শহরের সমপর্যায়ে উন্নীত। এমনকি ঢাকার লোকদের খরচ করার সক্ষমতা ভারতের কয়েকটি মেট্রোপলিটন শহরের অধিবাসীদের চেয়েও বেশি। আওয়ামী লীগ জনগণের আকাঙ্ক্ষা উপলব্ধি করে ২০২১ সালের মধ্যে বাংলাদেশকে একটি উন্নত দেশে রূপান্তরের মহান ব্রত গ্রহণ করেছে।

বিশ্বের অন্যতম বৃহত্ আর্থিক প্রতিষ্ঠান এইচএসবিসি’র (হংকং-সাংহাই ব্যাংকিং কর্পোরেশন) বার্ষিক রিপোর্টে বলা হয়েছে, বাংলাদেশ বিশ্বের ২৬তম বৃহত্ অর্থনীতির দেশে পরিণত হতে যাচ্ছে। একই সঙ্গে বাংলাদেশ অর্থনৈতিক উন্নয়নের দিক থেকে ফিলিপাইন, পাকিস্তান, ভিয়েতনাম ও মালয়েশিয়াকে পেছনে ফেলে দেবে। বাংলাদেশ বিশ্বের ১১টি উদীয়মান অর্থনীতির দেশেরও অন্তর্ভুক্ত। এই দেশগুলি হলো—দক্ষিণ কোরিয়া, মেক্সিকো, মিসর, ইন্দোনেশিয়া, ইরান, নাইজেরিয়া, পাকিস্তান, ফিলিপাইন, তুরস্ক ও ভিয়েতনাম। এই দেশগুলি পাঁচটি ব্রিক অন্তর্ভুক্ত দেশের মধ্যে চারটি তথা ব্রাজিল, রাশিয়া, ভারত ও চীনের পরই একুশ শতকের সবচেয়ে বৃহত্তম অর্থনীতির দেশে পরিণত হওয়ার জন্য প্রস্তুত।

একসময়ের অনুন্নত বাংলাদেশ আজ একটি উন্নয়নশীল দেশ। অর্থনৈতিক এই উন্নয়নের পেছনে রয়েছে শেখ হাসিনার অবদান ও কৃতিত্ব। ১৯৯৬ সালে তিনি যখন প্রথমবারের মতো প্রধানমন্ত্রী হন, তখনই এর ভিত্তি রচনা করেন। ১৯৭৫ সালে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নৃশংস হত্যাকাণ্ডের দুই দশক পর তিনি ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হন। ১৯৯৬-২০০১ সাল পর্যন্ত তাঁর প্রচেষ্টায় অর্থনৈতিক উন্নয়নের যে ভিত্তি স্থাপিত হয়, পরে দুঃখজনকভাবে বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের শাসনামলে তা হোঁচট খায়। এই সময় অত্যাচার-নির্যাতন, দুর্নীতি, ধর্মীয় উগ্রবাদ ও জঙ্গিবাদকে উসকে দেওয়া হয়। ২০০৮ সালের নির্বাচনের আগে শেখ হাসিনা ‘দিন বদলের সনদ ২০২১’ নামে তাঁর দলের নতুন মেনিফেস্টো ঘোষণা করেন। এর ফলে ২০০৮ সালের ২৯ ডিসেম্বর অনুষ্ঠিত নির্বাচনে তিনি ভূমিধস বিজয়লাভ করেন। তিনি ২০১৪ সালে ধারাবাহিকভাবে দ্বিতীয় মেয়াদে ক্ষমতায় এসে উগ্রবাদ ও জঙ্গিবাদের লাগাম টেনে ধরেন। শেখ হাসিনা বিশ্বব্যাংকের কাছ থেকে কোনো অর্থ না নিয়েই এবং বড় বড় শক্তির চোখ রাঙানিকে উপেক্ষা করেই নিজস্ব অর্থায়নে পদ্মা সেতু নির্মাণের ঝুঁকি গ্রহণ করেন। এটা কিভাবে সম্ভব হলো তা আজও একটি বিস্ময়।

শুধু তাই নয়, পরিসংখ্যান বলছে, বাংলাদেশে বিদেশি বিনিয়োগকারীদের আত্মবিশ্বাস দিন দিন বাড়ছে। ২০০৮ সালে আওয়ামী লীগ যখন ক্ষমতায় আসে, তখন দেশে যে পরিমাণ এফডিআই (ফরেন ডাইরেক্ট ইনভেস্টমেন্ট) এসেছিল, তা এখন তিনগুণ বেড়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিসংখ্যানে দেখা যায়, ২০০৮-০৯ অর্থবছরে বাংলাদেশে এফডিআই এসেছিল ৯৬১ মিলিয়ন মার্কিন ডলার যা ২০১৬-১৭ অর্থবছরে বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২,৪৫৪.৮১ মিলিয়ন ডলার। আর গত অর্থবছরে তথা ২০১৭-১৮ সালে এর পরিমাণ আরও বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২,৬০৭ মিলিয়ন ডলার।

বাংলাদেশের একজন সিনিয়র কর্মকর্তা আমাকে বলেছেন যে, ওয়ান স্টপ সার্ভিস চালুর পর বাংলাদেশের ব্যবসা-বাণিজ্যে গতি সঞ্চারিত হয়েছে। একই সঙ্গে বাংলাদেশ ইকোনমিক জোনস অথরিটি (বিইজেডএ-বেজা) ও বাংলাদেশ ইনভেস্টমেন্ট ডেভেলপমেন্ট অথরিটি (বিআইডিএ-বিডা) প্রতিষ্ঠার পর সার্বিকভাবে বিনিয়োগ পরিবেশের উন্নতি হয়েছে। বিনিয়োগকারীরা ব্যবসা শুরু করতে যেসব প্রতিবন্ধকতার সম্মুখীন হন, ওয়ান স্টপ সার্ভিস অ্যাক্ট তা দূর করতে সহায়ক হবে। একটি মাত্র অফিস থেকেই বিনিয়োগকারীদের দ্রুত সেবা দেওয়ার জন্য এখন একটি কর্তৃপক্ষ গঠনেও এই আইন পালন করবে কার্যকর ভূমিকা। গত জুন মাসে বাজেট বক্তৃতায় বাংলাদেশ সরকারের সদ্য বিদায়ী অর্থমন্ত্রী এএমএ মুহিত বলেছিলেন, ‘এফডিআই আকর্ষণে ব্যর্থতার কারণগুলি সরকার আন্তরিকভাবে বিচার-বিশ্লেষণ করেছে, এর প্রতিবন্ধকতাগুলি চিহ্নিত করার পদক্ষেপ নিয়েছে এবং তা থেকে উত্তরণে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থাও গ্রহণ করেছে।’ একইসঙ্গে তিনি বলেছিলেন, ‘আমি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি, ২০১৫ সাল থেকে একটি স্থিতিশীল ও অগ্রসরমান অর্থনীতির সূচনার পর আমরা এখন আগের চেয়ে অনেক বেশি বৈদেশিক বিনিয়োগ আকর্ষণে সক্ষম।’

শেখ হাসিনার সরকার ২০১০ সালে পাস করে বাংলাদেশ ইকোনমিক জোনস অ্যাক্ট। এরও উদ্দেশ্য বৈদেশিক বিনিয়োগ আকর্ষণ করা। এই আইন অনুযায়ী পাবলিক-প্রাইভেট পার্টনারশিপে (পিপিপি) দুটো অর্থনৈতিক অঞ্চল তৈরি হওয়ার কথা। একটি খুলনার মংলা ও অন্যটি চট্টগ্রামের মীরসরাইতে। একইভাবে জিটুজি (গভর্নমেন্ট টু গভর্নমেন্ট) ভিত্তিতে চীন, ভারত ও জাপানের জন্য চারটি অর্থনৈতিক অঞ্চল প্রতিষ্ঠিত হবে। ভারত মংলা ও মীরসরাইতে অর্থনৈতিক অঞ্চল তৈরি করবে। নারায়ণগঞ্জের আড়াইহাজারে জাপান তৈরি করছে বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল। ইতোমধ্যে এখানকার ভূমি অধিগ্রহণের কাজ শেষ হয়েছে। অন্যদিকে চীন চট্টগ্রামের আনোয়ারায় একটি বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল গঠন করতে যাচ্ছে।

এর আগে ঢাকার সিভিল সোসাইটির একজন সিনিয়র সদস্য আমাকে জানান যে, ২০০১-০৬ সময়কালের বিএনপি-জামায়াত সরকারের আমলের সঙ্গে বর্তমান আমলের কোনো তুলনা চলে না। বিএনপি-জামায়াত সরকারের আমলে উগ্র ইসলাম ও পাকিস্তানপন্থি শক্তির পৃষ্ঠপোষকতা করা হয়। এমনকি ২০০৪ সালের ২১ আগস্ট শেখ হাসিনাকে হত্যার টার্গেট করে আওয়ামী লীগের সমাবেশে গ্রেনেড হামলা করা হয়। কেননা তারা ইসলামি উগ্রপন্থা, সন্ত্রাসবাদ ও দুর্নীতির বিরোধিতা করেছিলেন। তা ছাড়া ২০২১ সালে বাংলাদেশ যখন স্বাধীনতার সুবর্ণ জয়ন্তী উদযাপন করবে, তখন বঙ্গবন্ধু-কন্যা শেখ হাসিনা ও আওয়ামী লীগের ক্ষমতায় থাকাটাই উপযুক্ত। এছাড়া গত ১০ বছরে বাংলাদেশ ও প্রতিবেশী দেশগুলোর মধ্যে বিশেষ করে ভারতের সঙ্গে কানেকটিভিটির ক্ষেত্রে ব্যাপক অগ্রগতি হয়েছে। বাংলাদেশ বিমসটেকে নেতৃস্থানীয় ভূমিকা পালন করছে। বাংলাদেশ, ভারত, মালদ্বীপ, শ্রীলঙ্কা, থাইল্যান্ড, নেপাল ও ভুটানকে নিয়ে বহুমুখী সহযোগিতা সংস্থা বিমসটেক গঠিত হয়েছে। বাংলাদেশ দক্ষিণ এশিয়ার পূর্বাঞ্চলে অবস্থিত। বাংলাদেশের এই ভৌগোলিক অবস্থান চমকপ্রদ। এর ফলে ভুটান, ভারত ও নেপালকে আসিয়ান ও পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোর সঙ্গে সংযুক্ত করতে বিভিন্ন পদক্ষেপ গ্রহণে বাংলাদেশ হবে একটি সেন্টার পয়েন্ট বা কেন্দ্রবিন্দু। এই অঞ্চলে ব্যবসা-বাণিজ্য, বিনিয়োগ ও কানেকটিভিটির মাধ্যমে বাংলাদেশ নতুন মার্কেট, মানসম্পন্ন ও কম মূল্যের পণ্য সরবরাহ এবং পরিবহন ও সেবাখাত থেকে ব্যাপকভাবে লাভবান হতে পারে। গত রবিবার নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ভারতের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা দ্য ইকোনমিক টাইমসকে দেওয়া এক সাক্ষাত্কারে বাংলাদেশের এমন সম্ভাবনার কথাই তুলে ধরেছেন।

বাংলাদেশ ভারতের সঙ্গে স্থল, রেল ও সমুদ্রপথে বিভিন্ন উপ-আঞ্চলিক কানেকটিভিটি প্রকল্পের সঙ্গে জড়িত। এসব কানেকটিভিটি প্রকল্প ভারতের উত্তর-পূর্ব রাজ্যগুলোর সঙ্গে বাংলাদেশের অধিক বাণিজ্যের সুযোগ তৈরি করে দেবে। ভারত বাংলাদেশের মাধ্যমে রেলওয়ে ও সড়ক ট্রানজিটের ব্যাপারে আগ্রহী—যাতে স্বল্প সময়ে ও খরচে বিভিন্ন পণ্য তার উত্তর-পূর্বাঞ্চলে পাঠাতে পারে। দক্ষিণ এশিয়ার পূর্বাঞ্চলীয় দেশ বাংলাদেশ, ভুটান, নেপাল ও ভারত (বিবিআইএন) ২০১৫ সালে মোটর ভিহিকেলস অ্যাগ্রিমেন্ট (এমভিএ) নামে একটি চুক্তি স্বাক্ষর করে। এই অঞ্চলের সংহতি ও অর্থনৈতিক উন্নয়নের জন্য এরও গুরুত্ব অনস্বীকার্য। এর লক্ষ্য ভুটান, বাংলাদেশ, নেপাল ও ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলকে চট্টগ্রাম ও কলকাতা বন্দরের সঙ্গে সংযুক্ত করা। এমভিএ’র আওতায় ইতোমধ্যে ঢাকা-কলকাতা-আগরতলা ও ঢাকা-শিলং-গুয়াহাটি বাস সার্ভিস চালু হয়েছে। একই সঙ্গে খুলনা-কলকাতা ও যশোর-কলকাতা বাস সার্ভিসের বিষয়টি বিবেচনাধীন। সম্ভাবনমায় ব্লু ইকোনমি তথা সমুদ্রকেন্দ্রিক অর্থনৈতিক জাগরণের স্বার্থে বাংলাদেশ ও ভারত ঐতিহ্যবাহী রেল রুটগুলোকেও পুনরুজ্জীবিত করার উদ্যোগ নিয়েছে। বাংলাদেশের গভীর সমুদ্রবন্দরগুলোর ভৌগোলিক অবস্থান ব্যবসা-বাণিজ্য সমপ্রসারণে খুবই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে। এর মাধ্যমে কেবল সার্কভুক্ত দেশ নয়, চীনসহ আসিয়ান দেশগুলোর জন্য বাংলাদেশ একটি বিশাল আঞ্চলিক পরিবহন হাব বা কেন্দ্রস্থলে পরিণত হতে পারে।

এখন পরবর্তী পাঁচ বছরে শেখ হাসিনা সরকারের সামনে যেসব চ্যালেঞ্জ রয়েছে তা হলো— চীনের ঋণ ফাঁদ থেকে সুরক্ষা, দুর্নীতির বিরুদ্ধে লড়াই, সরকারে সমমনা ব্যক্তিদের অন্তর্ভুক্তিকরণ ও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি বজায় রাখতে এই সংক্রান্ত প্রতিষ্ঠানগুলো শক্তিশালীকরণ।


৭১বিডি২৪ডটকম/অঞ্জন রায় চৌধুরী/ইত্তেফাক

Recommended For You

About the Author: HumayrA

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *