শহীদ বুদ্ধিজীবী দায়িত্বরত আসল মানুষ, হত্যা চক্রান্তের যে মানুষ

৭১বিডি২ডটকম | নজরুল ইসলাম তোফা ::

বাংলাদেশের সব জনগণের পালিত একটি বিশেষ দিবস। শহীদ বুদ্ধিজীবী দিবস। প্রতি বছরেই বাংলাদেশে ১৪ ডিসেম্বর দিনটিকে শহীদ বুদ্ধিজীবী দিবস হিসেবে গন্য করা হয়। ১৯৭১ সালের দশ থেকে চোদ্দ ডিসেম্বর পর্যন্ত এদেশের প্রথম শ্রেণীর সকল বুদ্ধিজীবীকে হত্যা করেছিল পাকিস্তান হানাদার বাহিনি এই বাংলাদেশে এসে । এমন কর্মকান্ডের মধ্যে এদেশের রাজাকার, আল বদর, আল শামস, বাহিনীর অসংখ্য লোকেরা পাকিস্তান সেনাবাহিনীকে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে সহযোগিতা করেছিল। সেই সত্যের প্রতি বিশ্বাস না হারিয়ে সততা মধ্য নিয়েই প্রদ্ধাবোধ জাগ্রত করে বাংলাদেশের জনগণ।

তাছাড়াও মনীষাদীপ্ত শ্রেষ্ঠ সন্তানেরা আজকের এই দিবসটিকেই বেদনা-জর্জরিত গৌরবের ইতিহাস মনে করে স্মরণ করে। আর ইতিহাস আমাদের শিক্ষা দেয় যে, সব অবিচার ও সকল প্রকার মানবিক নিগ্রহ অবসম্ভাবী রূপেই বিদ্রহ, বিপ্লব কিংবা অভ্যুত্থানের সঙ্গে এমন কি দেশপ্রেম সমূহকে বিখণ্ডিত করে স্বাধীন রাষ্ট্র গঠনে প্রবৃত্তি সৃষ্টি করে। সুতরাং- এই বাংলাদেশের ইতিহাসের একটি প্রকৃষ্ট দৃষ্টান্ত।

একটু জানা দরকার যে, প্রচলিত ধারণা অনুযায়ী যারা দৈহিক শ্রমের বদলেই মানসিক শ্রম বা বুদ্ধি বৃত্তিক শ্রম দেন তারাই জাতির কাছে বুদ্ধিজীবী। বাংলা একাডেমী প্রকাশিত গ্রন্থে বুদ্ধিজীবীদের যে সংজ্ঞা দেয়া আছে তা হলো বুদ্ধিজীবী অর্থ যেমন লেখক, বিজ্ঞানী, চিত্রশিল্পী, কণ্ঠশিল্পী, স্থপতি, ভাস্কর, চলচ্চিত্র এবং নাটকের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি, রাজনীতিক, সমাজসেবী কিংবা সংস্কৃতি সেবী, সব শিক্ষক, গবেষক, চিকিৎসক, সরকারি এবং বেসরকারি কর্মচারী, প্রকৌশলী, আইনজীবী এছাড়াও সাংবাদিক মহল বুদ্ধিজীবীদের সংজ্ঞায় পড়ে। দেশের স্বাধীনতার জন্য এরাই মৃত্যু বরণ করেছে। এরাই চরম মূল্য দিয়েছে।

প্রায় ‘৯ মাস’ রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের পর এদেশ স্বাধীন হয়েছে। পাকিস্তান দেশটি অগণতান্ত্রিক কিংবা অবৈজ্ঞানিক রাষ্ট্র গঠনের পর থেকেই যেন বাঙালিদের ও পূর্ব পাকিস্তানীদের সঙ্গে পশ্চিমপাকিস্তানের রাষ্ট্র-যন্ত্র বৈষম্যমূলক আচরণ করতে থাকে। পূর্ব পাকিস্তান স্থান স্বাধীন করেই আজকের ‘বাংলাদেশ’। তারা বাঙালিদের ভাষা সহ বিভিন্ন সংস্কৃতির উপরে আঘাত করেছে। তার ফলশ্রুতিতেই বাঙালির মনে চরম ক্ষোভ পুঞ্জিভূত হতে থাকে। বাঙালিজাতিরা সেই পাকিস্তানীর এ অবিচারের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক কিংবা সাংস্কৃতিক আন্দোলন শুরু করে। স্বদেশ স্বাধীনের আন্দোলনেই যেন সকল শ্রেণীর বুদ্ধিজীবীরা নেতৃত্বে আসে এবং তাদেরই মৃত্যু হয়, তাই তো তারাই শহীদ বুদ্ধিজীবী, আমাদের গর্ব। আলোচনায় একটু বিস্তারিত তোলে ধরা প্রয়োজন।

তা হলো- ১৯৭১ সালের ১৪ ডিসেম্বরেই মহান মুক্তিযুদ্ধের চূড়ান্ত বিজয়ের প্রাক্কালেই পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী এবং তাদেরই মদদে এ দেশীয় দোসর রাজাকার, আল বদর, আল শামস বাহিনী জাতির শ্রেষ্ঠ সন্তানসহ বরেণ্য হাজার হাজার শিক্ষাবিদ, গবেষক ও চিকিৎসক কিংবা প্রকৌশলী, সাংবাদিক, কবি, সাহিত্যিকদের চোখ বেঁধে বাড়ি থেকে ধরে নিয়ে তাদের ওপর চালায় নির্মম-নিষ্ঠুর নির্যাতন তারপরই যেন নারকীয় হত্যাযজ্ঞ। এটা তাদের কপালে অবধারিত হয়েছিল। আসলে বুদ্ধিজীবীরাই যে জাতির বিবেক, তারা সু-কৌশলেই জাগিয়ে রেখে ছিল জ্ঞানের আলো দ্বারাই বিভিন্ন রচনাবলী, সাংবাদিকরাও তাদের কলমের মাধ্যমে, শিল্পীরা গানের সুরে, শিক্ষকরা শিক্ষালয়ে পাঠদানে ক্ষেত্রে বহু কৌশল অবলম্বন করে, ডাক্তার চিকিৎসা ক্ষেত্রে, প্রকৌশল, রাজনীতি ইত্যাদির মাধ্যমে জনগণের সান্নিধ্যেই এসেছিল।

তাই এ গুলোকে এই দেশের দোসর যাকে আমরা সবাই রাজাকার বলেই জানি বা চিনি। তারা পাকিস্তানের কাছে জানানোর পরে বুদ্ধিজীবীদের হত্যা করার অনেক প্লান তৈরি করে। বলা যায় একটি জাতিকেই নির্বীজ করে দেবার প্রথম উপায় বুদ্ধিজীবী শূন্য করে দেয়া। ২৫ মার্চ রাতে এ প্রক্রিয়াটাই শুরু হয়েছিল অতর্কিত ভাবে, তারপর ধীরে ধীরে, শেষে পরাজয় অনিবার্য জেনেই যেন ডিসেম্বর ১০ তারিখ হতে ১৫ ডিসেম্বরের মধ্যে যেন দ্রুত গতিতে এ বুদ্ধিজীবীদের শেষ করেছে। সুতরাং চোদ্দ ডিসেম্বর দিনটিকেই ভয়ঙ্কর দিন হিসেবে চিহ্নিত করেই বাংলাদেশের সকল শ্রেণী ও পেশার মানুষ- “শহীদ বুদ্ধিজীবী দিবস” হিসাবে পালন করে আসছে।

আর একটু পরিস্কার আলোচনা যদি যাওয়া হয় তাহলে বলা যায় ১৯৭১ সালের ১৪ ডিসেম্বরের হত্যাকাণ্ড ছিল পৃথিবীর ইতিহাসে জঘন্যতম বর্বর ঘটনা, যা বিশ্বব্যাপী শান্তিকামী মানুষকে স্তম্ভিত করেছিল। পাকিস্তানিবাহিনী ও তাদের এ দেশীয় দোসররা পৈশাচিক হত্যাযজ্ঞের পর ঢাকার মিরপুর, রায়েরবাজার সহ নানা স্থানের অসংখ্য বুদ্ধিজীবীদের লাশ ফেলেও রেখেছিল। তা ১৬ ডিসেম্বর মুক্তিযুদ্ধে বিজয় অর্জনের পরপরই নিকটতম আত্মীয়- সজনরা মিরপুর এবং রাজারবাগ বধ্যভূমিতে স্বজনের লাশ গুলো খুঁজে পায়। বর্বর পাক বাহিনী বা রাজাকার বাহিনী দেশের শ্রেষ্ঠ সন্তানদের পৈশাচিকভাবে নির্যাতন করাটা ছিল বৃহৎ অন্যায়। বুদ্ধিজীবীদের লাশজুড়ে ছিল আঘাতের চিহ্ন, চোখ, হাত-পা বাঁধা এবং কারো কারো শরীরে একাধিক গুলি, অনেককেই হত্যা করা হয়েছিল ধারালো অস্ত্র দিয়ে জবাই করে। এ লাশের ক্ষত চিহ্নের কারণে অনেকে তাঁদের প্রিয়জনের মৃতদেহ যেন শনাক্ত করতেই পারেননি।

১৯৭২ সালে জাতীয়ভাবে প্রকাশিত বুদ্ধিজীবী দিবসের সঙ্কলন, পত্রিকায় প্রকাশিত সংবাদ এবং আন্তর্জাতিক নিউজ ম্যাগাজিন ‘নিউজ উইক’-এর সাংবাদিক নিকোলাস টমালিনের লেখা হতেই তা জানা যায়, শহীদ বুদ্ধিজীবীর সংখ্যা মোট ১ হাজার ৭০ জন। তাই স্বাধীন রাষ্ট্র গঠনের ক্ষেত্রে এদেশের বুদ্ধিজীবীদের অবদান অনেক উর্ধ্বমুখী। তাদেরকে বারবারই স্মরণে রাখা উচিত। সুতরাং ১৯৭১ সালের ১৪ ডিসেম্বর এবং এর আগে যে সব মহান সন্তান শাহাদাৎবরণ করেছে, তাদের প্রত্যেকে এক একজন উজ্জ্বল নক্ষত্র। তাদের জীবন কাহিনী ও আদর্শ এবং দেশপ্রেম এ জাতিকে পথ দেখাবে চিরকাল তাকে স্মরণে রাখা উচিত।

শহীদ বুদ্ধিজীবীদের ত্যাগ ও আদর্শ আর চলার পথটিকে আজকের তরুণ প্রজন্মের কাছে খুব ভালো ভাবে জাগ্রত করা প্রয়োজন। তাহলেই তারা উদ্বুদ্ধ এবং অনুপ্রাণিত হবে। তারা দেশের অন্যায় অমানবিকতার বিরুদ্ধে সোচ্চার হয়ে জাতিকে শক্তি ও সাহস যোগাবে। পুরো বছরের মধ্যে ১৪ ডিসেম্বর এলেই শুধু মাত্র বুদ্ধিজীবীদের কথা জাতি যেন স্মরণে আনে। এটা বাঙালি জাতির একটি চরম ব্যর্থতাই বলবো। এই দেশের শ্রেষ্ঠ সন্তানদের স্মৃতি বিজড়িত রায়ের বাজার বধ্যভূমি এবং মিরপুরের বুদ্ধিজীবীদের স্মৃতি সৌধের অব্যবস্থাপনা, অমর্যাদা আর নিরাপত্তাহীনতার বিষয়টি নিয়ম করেই সংবাদ মাধ্যমে জাতির নিকট উপস্থাপন করা প্রয়োজন।

  • লেখক: নজরুল ইসলাম তোফা
  • টিভি ও মঞ্চ অভিনেতা, চিত্রশিল্পী, সাংবাদিক, কলামিষ্ট এবং প্রভাষক

Recommended For You

About the Author: HumayrA

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *