বুধবার, ১৯ মে ২০২১, ০৩:০৮ পূর্বাহ্ন
নোটিশ বোর্ড :
দেশের সকল বিভাগের জেলা, উপজেলা, থানা পর্যায়ে প্রতিনিধি আবশ্যক আগ্রহী প্রার্থীগন আমাদের সাথে যোগাযোগ করুন। মোবাইল নম্বরঃ +8801618833566, ইমেইলঃ 71bd24@gmail.com

গলাচিপা আব্দুল গনি স্মৃতি পাঠাগার ঠাঁই হয়েছে হাসপাতালে

সাইমুন রহমান এলিট / ৮৩১ শেয়ার
আপডেটের সময়ঃ বুধবার, ২০ ফেব্রুয়ারী, ২০১৯

কিছু জ্ঞান পিপাষু বিশ্ববিদ্যালয়, কলেজ পড়–য়া বন্ধুরা মিলে উপকূলীয় যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন গলাচিপায় ব্যক্তিগত উদ্যোগে গড়ে তোলেন একটি পাঠাগার। এলাকার প্রবীণ সাংবাদিক এবং সমাজকর্মী গনি মিয়ার নামে নাম দেয়া হয় ‘আব্দুল গনি স্মৃতি পাঠাগার’। প্রথম দিকে বিশ্ব বিদ্যালয়ের ও কলেজ পড়ুয়া বন্ধুরা বই ও পত্রিকা পাঠভ্যাসের পাশাপাশি সাংস্কৃতিক বিভিন্ন কর্মকান্ডে সম্পৃক্ত হওয়ার লক্ষ্য নিয়ে আবদুল গনি স্মৃতি পাঠগার প্রতিষ্ঠা করে। শুরুর দিকে সুব্রত রায়, আনোয়ার হোসেন সিপন, মো. কাওসার, বিধান কর্মকার, পলাশ কর্মকার, সুজয় দাস, সুনির্মল গণপতিসহ কয়েকজন মিলে গলাচিপার বিভিন্ন সাংস্কৃতিক কর্মকান্ডে জড়িয়ে পরেন। এক পর্যায় তারা উপলব্দি করতে পারেন পাঠাগারের প্রয়োজনীতা।

নানা প্রতিকূলতার মধ্য দিয়ে যেভাবে চলতে হয়-

১৯৯৭ সালের ১৯ জুলাই নিজেরদের ব্যক্তিগত সংগ্রহের বইগুলো পাঠাগার করার জন্য এক জায়গায় জড়ো করেন তারা। এসময় তাদের বই সংখ্যা মাত্র ৪৪টি। ওই বছরের ১৯ জুলাই তারিখটিই তারা প্রতিষ্ঠার তারিখ হিসেবে গন্য করেন। নিজেদের বাসা থেকে ভাঙ্গ ও পরিত্যাক্ত চেয়ার-টেবিল দিয়ে পথ চলতে শুরু করে আব্দুল গণি স্মৃতি পাঠাগার। এসময় পিছন থেকে অনুপ্রেরণা দেন বীর মুক্তিযোদ্ধা ডা. আব্দুল মালেক ও ডা. অনীল মÐল। পাঠাগারের বই সংগ্রহ হলেও পাঠ কক্ষ ছিলনা তাদের। অস্থায়ীভাবে গলাচিপা উপজেলা মুক্তিযোদ্ধা কমান্ড কাউন্সিল অফিসে জায়গা হয় পাঠাগারটির। সেখানে কিছু দিন থাকার পর ২০০১ সালে ক্ষমতার পটপরিবর্তনের পর পরই মুক্তিযোদ্ধা কমান্ড কাউন্সিল অফিসের রুমটি ছেড়ে আসতে হয় পাঠাগারের। পরে স্থানীয় বালিকা মাধ্যমিক বিদ্যালয় রোডে ৪৫০ টাকা ভাড়া করা ছোট্ট একটি কক্ষে চলে এর কার্যক্রম। অর্থাভাবে সে ঘরটিও ছেড়ে আসতে হয়। অস্থায়ী ঠাই হয় গলাচিপা মাধ্যমিক শিক্ষক সমিতির পরিত্যাক্ত ঘরে। খুড়িয়ে খুড়িয়ে চলতে থাকা পাঠাগারটির আসবাব পত্র ও বই নষ্ট হয়ে যাচ্ছিল। ২০০৭ সালে উপকূলীয় এলাকার উপর দিয়ে বয়ে যাওয়া প্রলয়ঙ্করী ঘূর্ণিঝড় সিডরে লন্ডভন্ড করে দেয় বহু ঘর-বাড়ি, ফসলের ক্ষেত ও অসংখ্য মানুষের প্রাণহানি ঘটে। এতে ক্ষতিগ্রস্থ হয় পাঠাগরের বই ও আসবাব পত্র। এসময় পাঠাগারের সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দেয় ‘প্রথম আলো পত্রিকার বন্ধুসভা’। তারা পাঠাগারের আসবাব পত্র ও ৫০০ বই দিয়ে সহযোগিতা করে। কিন্তু এর কিছু দিন পরেই পাঠাগরের নিজস্ব ঘর না থাকায় শিক্ষক সমিতির ঘরটিও ছেড়ে দিতে হয়। বই ও আসবাব পত্র রাস্তার পাশে, কিছু কিছু বিভিন্ন জনের ঘরে ঘরে রাখা হয়। এসময় বীর মুক্তিযোদ্ধা ডা. আব্দুল মালেকের একান্ত প্রচেষ্টায় কালিবাড়ি রোডে পরিত্যাক্ত গলাচিপা পুরান হাসপাতালের ভাঙ্গা একটি কক্ষে ঠাঁই হয় পাঠাগারের। এখন পর্যন্ত সেখানেই ভীড় করছেন জ্ঞান পিপাষু শিক্ষার্থী, যুবক ও প্রবীণরা।


গলাচিপা আব্দুল গনি স্মৃতি পাঠাগার ঠাঁই হয়েছে হাসপাতালে


জ্ঞান পিপাষুদের কোলাহলে মুখরিত পাঠাগার কক্ষ-

শুক্রবার বিকেলে সাড়ে চারটায় আব্দুল গনি স্মৃতি পাঠাগারের পাঠ কক্ষে গিয়ে দেখা যায় বিভিন্ন শ্রেণির কয়েকজন শিক্ষার্থী গভীর মনোযোগ দিয়ে কেউ বই পড়ছেন কেউ বা পত্রিকা। কলেজ পড়–য়া মিতু আখতার, ফয়সাল, এসএসসি পরীক্ষার্থী মো. সাইদুল ইসলাম, নবম শ্রেণির শিক্ষার্থী সাইদুল ইসলাম সাইদ, সৌরভ, পঞ্চম শ্রেণির বৃষ্টি বই পড়ছেন। কোন বই বেশি পছন্দ জানতে চাইলে মিতু আকতার বলে, হুমায়ুন আহমেদ এর বই বেশি পছন্দ। এ ছাড়া আত্মজীবনী পড়তে ভালো লাগে। পাঠাগারে সম্পৃক্ত হলে কিভাবে ? এমন প্রশ্নের জবাবে মিতু বলে, ‘২০০১৫ সালে পাঠাগারের উদ্যোগে কুইজ ভিত্তিক ‘আমিও পারি’ একটি অনুষ্ঠানে উদয়ন মাধ্যমিক বিদ্যালয় থেকে আমি অংশগ্রহণ করি। মূলত ওই সময় থেকেই পাঠাগার ও বই পড়তে আকৃষ্ট হই। এখন পর্যন্ত আমি নিয়ম করে পাঠাগারে বই পড়তে আসি। পাশাপাশি পাঠাগারের বিভিন্ন কাজেও অংশগ্রহণ করি। প্রতিবছর আমরা ছাত্র-ছাত্রীরা মিলে শহীদ বুদ্ধিজীবী দিবস, জাতীয় দিবস উদযাপন করি। পাশাপাশি স্কুল কলেজের ছাত্র-ছাত্রীদেরকে পাঠাগারে পাঠভ্যাস গড়ে তোলার জন্য ক্যাম্পেইন করি। গত কয়েক মাস আগে পাঠাগারের সব ছাত্র-ছাত্রী মিলে গলাচিপা ডিগ্রি কলেজে সদস্য সংগ্রহ করতে যাই। সেখানে শিক্ষার্থীদের বইমুখী করতে আমরা অমিরাম চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি।’


গলাচিপা আব্দুল গনি স্মৃতি পাঠাগার ঠাঁই হয়েছে হাসপাতালে


প্রাতিষ্ঠানিক পড়াশোনা থেকে দূরে সরে গেলেও রিয়ামনি নিয়মিত আসেন পাঠাগারে। তিনি সপ্তাহে দুই দিন সময় দেন আব্দুল গনি স্মৃতি পাঠাগারে। তারই পাশে বসা গলাচিপা সরকারি মডেল মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের নবম শ্রেণির শিক্ষার্থী সাইদুল ইসলাম সাইদ। ‘বঙ্গবন্ধুর অসমাপ্ত আত্মজীবনী’ বইটি নিয়ে বেশ আগ্র নিয়ে পছিল। দৃষ্টি আকর্ষণ করে জানতে চাওয়া হয়, পাঠাগারের বইগুলো তার কাছে কেমন লাগে? সাইদ বলে, ‘পাঠাগারে অনেক বই রয়েছে। এতাগুলো বই বাসায় কিনে পড়া সম্ভব হয় না। এখানে এসে বইগুলো পড়ছি। জানতে হলে বই পড়তে হবে। বইয়ের বিকল্প কিছুই নাই। এখানে আমাদের শ্রেণি পাঠের সাথে সম্পৃক্ত বইও আছে।’ গলাচিপা মহিলা ডিগ্রি কলেজের বিএ দ্বিতীয় বর্ষের আরক শিক্ষার্থী ও শুভসংঘের সদস্য সাবিনা বলেন,‘সামাজিক কাজ করতে আমরা ভালো লাগে। বিশেষ করে পাঠাগারে এতো বই যা হাত বাড়ালেই পাওয়া যায়। এমন সুযোগ আমি নষ্ট করতে চাইনি বলেই নিয়মিত পাঠাগারে এসে বই পড়ি।’ পাঠাগারে বৃহস্পতি ও শুক্রবার সাধারণত শিক্ষার্থীদের ভীড় থাকে বেশি। বাকি দিনগুলোতে জড়ো হয় বিভিন্ন শ্রেণি পেশার মানুষ। এমনকি কলেজের বর্তমান ও সাবেক অধ্যক্ষ থেকে শুরু করে অধ্যক্ষ এবং প্রভাষক, শিক্ষকরা। বুধবার বিকেলে পাঠাগারে গিয়ে দেখা হয় গলাচিপা সরকারি ডিগ্রি কলেজের সাবেক অধ্যক্ষ মো. রফিকুল আলমের সাথে। তিনি ছোট বড় নানা বয়সী শিক্ষার্থীদের নিয়ে মনোযোগ দিয়ে বই পড়ছেন। সপ্তাহের প্রতিদিন বিকেলে জ্ঞানপিপাষুদের কোলাহলে মুখরিত হয়ে ওঠে পাঠাগারটি। প্রতিদিন বিকেল ৪টা থেকে বিভিন্ন গ্রুপে বিভক্ত হয়ে ৮০-৯০জন স্কুল কলেজ পড়–য়া শিক্ষার্থীসহ প্রবীণরাও পাঠাগার কক্ষে ভীড় জমান বই পড়ার জন্য।

উদ্যোক্তারা যা বলেন –

আব্দুল গনি স্মৃতি পাঠাগারের অন্যমত উদ্যোক্তা সুব্রত রায় ও আনোয়ার হোসেন শিপন জানান, শুধু পুঁথিগত বিদ্যাই নয়। সামাজিক ও সাংস্কৃতিক কর্মকান্ডের সাথে ছাত্র-ছাত্রীদের সম্পৃক্ত করে দেশাত্মবোধকে জাগ্রত করার জন্যই পাঠাগারটি প্রতিষ্ঠা করা হয়। যখন শুরু করেছি তখন আমরা ছাত্র ছিলাম। এখন কর্মজীবী হলেও বর্তমানে যেসকল শিক্ষার্থীরা নিয়মিত পাঠাগারে যাতায়েত করে তাদেরকে সঠিক পথে চলতে সহযোগিতা আমরা করে থাকি।

পাঠাগারের বর্তমান সাধারণ সম্পাদক রাকিবুল হাসান রুসেল বলেন, সেই ছাত্রজীবন থেকে একটা দায়বদ্ধতা নিয়ে এখনো পাঠাগার কর্মী হিসেবে কাজ করছি। বর্তমান প্রজন্মের শিক্ষার্থীরা যেভাবে বই বিমুখ হয়ে মাদক, মোবাইলে আসক্ত হয়ে যাচ্ছে তাতে ভবিষ্যৎ খুবই ঝুকিপূর্ণ হয়ে যাচ্ছে। এ কারণেই পাঠাগারে বেশি সময় দেয়া। উপজেলা শহরে বেসরকারিভাবে একমাত্র পাঠাগারটিতে সাধ্যমতো বিভিন্ন সুযোগ সুবিধা দেয়া হচ্ছে। মাসিক মাত্র ২০ টাকা চাঁদা দিতে হয় সদস্যদের। এখানে গল্প, উপন্যাস, বিভিন্ন গুণী ব্যক্তিদের আত্মজীবনী, স্বাধীনতার দলিল, দৈনিক পত্রিকা সরবারাহ করে বিভিন্ন শ্রেণির পাঠক আকৃষ্ট করার চেষ্টা করা হচ্ছে। কিন্তু এতা কিছুর পরেও কাঙ্খিত পাঠক পাওয়া যাচ্ছে না। পাঠাগারের পক্ষ থেকে বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে চিঠি দিয়ে পরিদর্শনের অনুরোধ জানানোর পরেও তেমন সাড়া পাওয়া যায়নি। বিশেষ করে এ ধরণের সংগঠনগুলোর দিকে সরকার সামন্য নজর দিলে আগামী প্রজন্ম বইয়ের দিকে আকৃষ্ট করে আলোর পথে ফেরানো সম্ভব। পাঠাগারটিকে সমৃদ্ধ করতে ব্যক্তিগত পর্যায়ে বিভিন্ন ব্যক্তি বই দিয়ে সহযোগিতা করেছেন। বর্তমানে ১৫০০ ও বেশি বই রয়েছে। বেসরকারি এ পাঠাগারে স্কুল কলেজের শিক্ষার্থীদেও মিলন মেলায় পরিণত হয়। জ্ঞান পিপাষু বিভিন্ন শ্রেণির শিক্ষার্থীদের বিকেলে ‘আড্ডা আর বই পড়ায়’ মুখরিত থাকে আব্দুল গণি স্মৃতি পাঠাগার। সময়ের সাথে তাল মিলিয়ে আবদুল গনি স্মৃতি পাঠাগার এখন সার্বজনীন পাঠাগার হিসেবে গড়তে পেরেছে বলে দাবি করছেন পরিচালনা পরিষদ।


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এ জাতীয় আরো সংবাদ